হিজাব নিয়ে সেক্যুলার ও কট্টরপন্থীদের বাড়াবাড়ি

হিজাব নিয়ে সেক্যুলার ও কট্টরপন্থীদের বাড়াবাড়ি বিশ্বের অনেক সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) দেশসহগুলোতে প্রায় শোনা যায় হিজাব নিষিদ্ধের আইন করতে । এমনকি আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে না হলেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষিদ্ধ করেছে এবং করছে । যারা যে কারণে হিজাব নিষিদ্ধের পক্ষে কথা বলছে বা করছে তাদের যুক্তিও অবজ্ঞা করা যায় না আবার ঢালাওভাবে এই হিজাব নিষিদ্ধকরণকেও সমর্থণ করা যায় না । যদি সেক্যুলারিজমের (ধর্মনিরপেক্ষতার) কথা বলে হিজাব নিষিদ্ধের প্রশ্ন উঠে তাহলে সেটা খোদ সেক্যুলারিজমই লঙ্ঘন করে । কারণ যেখানে সেক্যুলারিজম প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলছে সেখানে একটা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিশেষ পোষাকের বিরুদ্ধে লেগে পড়া অবশ্যই সেক্যুলারিজম নয় বরং বিশেষ ধর্মের প্রতি ধর্মীয়-বিদ্বেষিতা, সরাসরি বলতে গেলে ইসলামফোবিয়া । অন্যান্য দেশগুলোতে এই বার্তা পৌঁছবে কিনা জানিনা, তবে আমাদের দেশে যারা হিজাব নিষিদ্ধের পক্ষে তাদের প্রতি আমার দু-একটা কথা । এবং তাদের প্রতিও, যারা হিজাব নিষিদ্ধকরণের বিপক্ষে বলিষ্ঠ অবস্থান করছেন । কারণ প্রকৃত ইসলামে হিজাবের মানদন্ড জানা থাকলে অবশ্যই হিজাব নিষিদ্ধের প্রশ্নই উঠতো না । আর হিজাব নিষিদ্ধের প্রতিবাদও শোনা যেতো না ।


হিজাব ইসলামের কতটুকুন গুরুত্বপূর্ণ অংশ সেটা নির্ভর করছে ইসলামে অশ্লীলতা, অবৈধ কামনা-বাসনার ফলে ফিতনা বা বিপর্যয়ের পরিণামের উপর । ইসলাম শাব্দিক অর্থই শান্তি । তাই ইসলামে যত নিয়মনীতি আছে সবগুলোর মূল উদ্দেশ্য ব্যক্তি, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র তথা সমগ্র পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও নিশ্চিতকরণ । কোরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যারা নিজেদের ঈমানদার দাবি করে, নারী-পুরুষ উভয়কেই যৌনতার ব্যাপারে সংযত করে চলতে হবে । শুধু ইসলাম না, এটা প্রতিটা ধর্মই বলে । আমরা যারা গোড়াপন্থী মুসলিম, সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে অন্ধের ন্যায় ইসলাম পালন করে যাচ্ছি, আমাদের একটা মহাদোষ আছে । আল্লাহ হিজাবের ব্যাপারে যতটুকুন সীমা করে দিয়েছেন, ততটুকুন আমাদের কাছে পছন্দীয় নয় । এর বেশি করবো ! পায়ের পাতা থেকে চোখ, কোনোকিছুই বাদ রাখবো না । মুখ ঢেকে রাখতে হবে কেনো? মুখ ঢেকে রেখে হিজাব করতে বলেন নি আল্লাহ ।

স্পষ্টভাষায় কোরআনে আল্লাহ বলে দিয়েছেন,

“আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেনো তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে; তারা যেন তার মধ্যে যা সাধারণতঃ প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য্য প্রদর্শণ না করে, তাদের ঘাড় ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে, তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভাতুষ্পুত্র, ভগ্নীপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মধ্যে মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌনকামনা রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারো নিকট তাদের সৌন্দর্য্য প্রকাশ না করে । তারা যেন তাদের সৌন্দর্য্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে না হাটে । হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো ।” (সূরা নূর, ৩১ নং আয়াত)

আয়াতটিতে না বুঝার কিছুই নেই । ঘাড় ও বুক মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে রাখতে বলেছেন, মুখমন্ডল নয় । কারণ মুখমন্ডল স্বাভাবিক প্রকাশমান সৌন্দর্য্য । কোনো নারী যদি এখন মুখমন্ডল ঢেকে রাখে, তাহলে যে কারোও সন্দেহের উদ্রেক হবে কে এই নারী? নারীবাদে অন্য কেউ তো হতে পারে । অথবা এই মুখমন্ডল ঢাকা নারীটি হিজাবকে মুখোশ হিশেবে অপকর্মে ব্যবহার করছে না তার কিসের গ্যারান্টি? আমাদের দেশে পতিতারাও আজকাল হিজাব পরে আত্মপরিচয় লুকিয়ে রাখছে । তখন হিজাব হয়ে যায় একটা মুখোশ । হিজাবের ভিতরে মানুষটি কে? নিরাপত্তার তাগিদে প্রশ্ন উঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক । এখন একজন ধার্মিক নারীকে যদি বলা হয়, আপনার মুখটা খুলেন? আপনি কে? তখন ঐ ধার্মিক নারীটি যথেষ্ট বিব্রতিকর অবস্থায় পড়বে ।

আর মুমিন নারীরা যাতে এই উত্যক্তকর পরিস্থিতির শিকার না হোন, সেজন্যই আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন,

“হে নবী, তুমি তােমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিন নারীদেরকে বলঃ তারা যেনে তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয় । এতে তাদের চেনা সহজতর হবে; ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না । আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু ।” (সূরা আহযাব, ৫৯ নং আয়াত)


মুখমন্ডল ঢেকে রাখলে একজন মানুষকে চেনা সহজ হবে নাকি খুলে রাখলে? এরকম বোকার মতো প্রশ্ন করে পাঠকসমাজকে বিব্রত করতে চাই না । ধার্মিক নারীটি যদি এভাবে মুখমন্ডল খুলে রেখে হিজাব করতো তবে তাকে মোটেও ও-রকম বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতো না । এতো সহজ ও সাবলীল ভাষায় আল্লাহ কোরআনে এতো সুন্দর করে বলে দিলেন, তারপরেও আমরা গোঁড়াপন্থী মুসলিমরা জোর করে হাদিস-ইজমা-কিয়াস-মাসলামাসায়েল ইত্যাদির মাধ্যমে ত্যানাপ্যাঁচিয়ে নারীদের সমগ্র মুখমন্ডল ঢেকে রেখে কিম্ভূতকিমাকার বানিয়ে রাখার পক্ষে যেখানে আল্লাহ কোরআনে বিভিন্ন জায়গায় বলে দিয়েছেন,

“আমি তোমাদের নিকট অবতীর্ণ করেছি সুস্পষ্ট আয়াত, তোমাদের পূর্ববর্তীদের দৃষ্টান্ত এবং মুত্তাকীদের জন্যে উপদেশ ।” (সূরা নূর, আয়াত ৩৪) “আমি পরিষ্কারভাবে তোমাদের জন্য আয়াতগুলো ব্যক্ত করেছি যাতে তোমরা বুঝো ।” (সূরা হাদীদ, আয়াত ১৭) “যারা আমার আয়াতসমূহকে ব্যর্থ করবার চেষ্টা করে তাদের জন্যে রয়েছে ভয়ংকর পীড়াদায়ক শাস্তি ।” (সূরা সাবা, ৫ নং আয়াত)


হিজাবের ব্যাপারে আল্লাহ যতটুকুন করতে বলেছেন আমাদেরকে ততটুকুনই করতে হবে । এর বাড়াবাড়ি বা সীমালঙ্ঘন করা গুরুতর অপরাধ, যা আল্লাহ কোরআনের পরতে পরতে বলে দিয়েছেন এভাবে –

“নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা বাকারাহ, আয়াত নং ১৯০)

এরপরেও যারা মুমিন নারীদের মুখমন্ডল ঢেকে রাখার পক্ষে তারা হয় আল্লাহর কথায় ভরসা পায় না, সন্তুষ্ট হয় না; নয় নারীদের মুখমন্ডল দেখে তাদের যৌনানুভূতি জেগে উঠে । আর যাদের এরকম হয়, তাদের ঈমান নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ও তারা ঘরে বসে থাকলেই পারে । তাদের জন্য ঈমানদার নারীরা কেনো কষ্টের শিকার হবে? অনেকে বলতে পারেন – হাদিস- ইজমা-কিয়াসে নারীদের হিজাবের ব্যাপারে অন্যকিছু বলা আছে । থাকতেই পারে । কিন্তু কোরআনে অনেক বিষয় আল্লাহ পরিষ্কার রূপে বুঝিয়ে দিয়েছেন যেমন- ওযু, তায়াম্মুম, বিবাহ, যাকাত, আত্ম ও যৌন সংবরণ অর্থ্যাৎ নারী-পুরুষের পর্দা, কারো ঘরে ঢুকার আগে কী বলে ঢুকতে হবে ইত্যাদি । এগুলো যেহেতু পরিষ্কার রূপে আল্লাহ নিজেই বর্ণনা করেছেন সেখানে কােরআন ব্যতীত অন্যত্র খোঁজা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ । আবার অনেক জিনিস যেমন- নামায কীভাবে পড়তে হবে, হজ্জ কিভাবে করতে হবে এগুলোর পালন পদ্ধতি তিনি কোরআনে বলেন নি, তাই সেগুলো আমাদেরকে হাদিস থেকেই জেনে নিতে হবে । তাছাড়া হাদিসে এটাও উল্লেখ আছে যে, সাবালিক মেয়ে হওয়ার পর তার মুখমন্ডল ও হাতের কবজি ব্যতীত অন্য কোনো অঙ্গ খোলা রাখা জায়েজ নয় অর্থ্যাৎ মুখমন্ডল ঢেকে রাখার পক্ষে বলা হয় নি । যেমনঃ

হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্নিত যে, হযরত আসমা (রাঃ) একবার পাতলা কাপড় পরিহিতা অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর নিকট আগমন করলে তিনি তাঁর দিক থেকে চেহারা ফিরিয়ে নেন এবং বলেন, হে আসমা! কোন মেয়ে যখন সাবালিকা হয় তখন তার মুখমন্ডল ও হাতের কবজি ব্যতীত অন্য কোন অংগ খোলা রাখা জায়েয নাই । (আবু দাউদ শরীফ-২/২৬৭)


তারপরেও মুখমন্ডল ঢেকে রাখার পক্ষে যতগুলো সহীহ হাদিস রয়েছে সবগুলোই রাসূল সাঃ এর পত্নীদের ক্ষেত্রে বর্ণিত হয়েছে । কারণ, সাধারণ নারী ও রাসূল সাঃ এর পত্নীদের ব্যাপারে পৃথক পৃথক নির্দেশ রয়েছে । আল্লাহ কোরআনের সূরা আহযাবের ৩০ থেকে ৩৩ নং আয়াতে যা বলেছেন তা হলো – নবী পত্নীরা আর সাধারণ নারীরা এক নয় । তাঁরা স্বগৃহে অবস্থান করবে । বাইরে নিজেদের স্বাভাবিক সৌন্দর্যও প্রদর্শণ করবে না । পরপুরুষের সাথে মিষ্টি কথা না বলে যথাসম্ভব কর্কশ কন্ঠে কথা বলবে যাতে কেউ আকৃষ্ট না হয় । শুধু তাই নয়, নবী-পত্নীরা যদি কোনো স্পষ্টত অশ্লীল কাজ করে তার শাস্তিও দ্বিগুণ আবার কোনো পুণ্য কাজ করলে তার বিনিময়ও দুবার । একই সূরার ৫৩ নং আয়াতে এটাও বলে দিয়েছেন, রাসূল সাঃ পত্নীদের কাছে কেউ কিছু চাইলে সেটা পর্দার আড়াল থেকে চাইতে হবে এমনকি রাসূল সাঃ এর ওফাতের পর কেউ নবীপত্নীদের বিয়েও করতে পারবে না । অথচ এই হুকুমগুলো সাধারণ নারীদের জন্য নয় । এটাই আল্লাহর বেঁধে দেয়া সীমা ।

মুখমন্ডল ঢেকে রাখার বিপক্ষে বলছি বলে ধরে নিবেন না যে আমি এমন হিজাবের পক্ষে কথা বলছি যা যৌন-সৌন্দর্যের সাক্ষ্য বহন করে । কোন হিজাব যৌন-সৌন্দয্য প্রদর্শণকারী আর কোনগুলো নয়, সেটা নারীরা ভালো করেই জানে । তারপরেও যদি জেনে না জানার ভান করে, তাহলে তার শাস্তি তিনি আল্লাহর কাছে পাবেন ।

এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাসঙ্গিক ব্যাপারে আসা যাক । হিজাব কেনো দেয়া হলো? আর এটা কি কেবল নারীদেরকেই দেয়া হয়েছে? হিজাবের ব্যাপারে সূরা নূরে যে আয়াত আল্লাহ বলেছেন তার প্রথমেই হুকুম দেয়া হয়েছে মুমিন পুরুষদেরকে । তিনি বলেছেন,

“মুমিন পুরুষদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে;এটা তাদের জন্য পবিত্রতম; তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ অবহিত ।” (সূরা নূর, ৩০ নং আয়াত)


তারপরে তিনি মুমিন নারীদেরকে এই নির্দেশসহ পূর্বল্লেখিতআরো কয়েকটি নির্দেশ দিয়েছেন ।

প্রকৃত ইসলামে এতো সুন্দরভাবে হিজাব নিয়ে বলা আছে, তারপরেও যদি এই হিজাব নিষিদ্ধের প্রশ্ন উঠে- হিজাব নিষিদ্ধ করা হোক! হিজাব পড়ে ক্লাসে আসা যাবেনা, অফিস যাওয়া যাবেনা, এই করা যাবে না, সেই করা যাবে না ইত্যাদি; তাহলে বুঝতে হবে হিজাবের প্রতি তাদের যে আক্রোশ ও ঘৃণা জন্ম নিয়েছে এটা তো মোটেই সেক্যুলারিজম নয়, বরং ইসলামফোবিয়া । যারা নিরাপত্তার তাগিদে হিজাব নিষিদ্ধকরণের পক্ষে কথা বলছেন বা চিন্তা করছেন আপনারা বরং কোরআনের আলোকে ছাত্রী বা কর্মীদের ইসলামে প্রকৃত হিজাবের কথা বুঝিয়ে বলুন । আর এ ব্যাপারে সবার আগে আলেম শ্রেণিটিকে এগিয়ে আসতে হবে । ইসলাম কারো উপর জোর করে চাপিয়ে দেবার জন্য আসে নি । কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, “ইসলামে কোনোরকমের জোরজবরদস্তি নেই” (সূরা বাকারাহ, আয়াত ২৫৬) । তাই কেউ যদি হিজাব না করতে চায়, তাকে জোরজবরদস্তি করা যাবে না বরং উপদেশ দিতে হবে হিজাব না করলে গোনাহ হবে । এভাবে হিজাব নিয়ে সচেতন হলে আশা করাই যায়, হিজাবের ব্যাপারে আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বে সবার হিজাবের প্রতি ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা ও সম্মান জন্মাবে ।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *