শুদ্ধ বাংলার খরচা বেশি

সাধারণত একটি ভাষার অঞ্চলভেদে অনেক রূপ থাকে। রূপভেদে ভিন্ন ঐ ভাষাগুলো সকল অঞ্চলের মানুষের কাছে সম্পূর্ণ বোধগম্য নয়। এজন্যই প্রয়োজন সকলের দ্বারা গৃহীত ও সর্বোচ্চ মার্জিত রূপের একটি আদর্শ ভাষা (স্ট্যান্ডার্ড ল্যাংগুয়েজ)। এ ভাষাকেই বাংলায় আমরা বলছি শুদ্ধ বা প্রমিত ভাষারীতি। প্রমিত বাংলা আমাদের রাষ্ট্রের সংবিধানের ভাষা, দাপ্তরিক ভাষা।

প্রমিতরীতি কেবলমাত্র সর্বজনগ্রাহ্যই নয়, এই ভাষার ব্যবহার আমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভাষাবোধ ভদ্রতার পরিচায়কও বটে। যেমন দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গ দুজন মানুষের যেকেউ একজন যদি তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষায় কথপোকথন শুরু করেন, মনের ভাব প্রকাশ করা কেবল দূরহই নয়, পরস্পরের প্রতি একধরণের অভদ্রতাও বটে। বাংলার প্রমিতরীতি এক্ষেত্রে সেতুবন্ধন রচনার পাশাপাশি ভাষার মূল উদ্দেশ্য তথা মনের ভাব প্রকাশ ও ভাষাগত ভদ্রতা-রুচিবোধও নিশ্চিত করে।

কিন্তু ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে প্রমিত বাংলা ভাষারীতির ব্যবহার দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। যারা এ ভাষায় কথা বলেন, তন্মধ্যেও অনেকে পুরোপুরি এই ভাষারীতি ব্যবহার করছেন না, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়। পুরো বাক্য প্রমিত বাংলায় বললেও বাক্যের মাঝখানে অথবা শেষে টেনে সেই নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষাই ব্যবহার করছেন। এটা মূলত নতুন প্রজন্মের মধ্যে বেশি লক্ষ্যণীয়। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-পরিজনের সাথে যেকেউ স্বাচ্ছন্দ্যমত যেকোন ভাষারীতি ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু ভয়ের বিষয় হলো যারা ইউটিউব-ফেসবুক সোশাল সাইটগুলোতে বিভিন্ন ধরণের ভিডিও, আর্টিকেল কন্টেন্ট তৈরি করছেন, তারাও একই কাজটা করছেন। এটা তারা কেন করছেন সে ব্যাপারে একটু পরে আসছি। ভয়ের বিষয় এজন্যই বললাম, তাদের এই ভাষারীতির অপব্যবহার ভাষা বিকৃতিতে জোরালো অবদান রাখছে। কারণ, উনাদের ঐ ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুক পেজে অনেক সাবস্ক্রাইবার-ফলোয়ার রয়েছেন, যারা উনাদের প্রতিনিয়ত অনুসরণ করছেন। তারা তাই অনুসরণ করছেন, যা তাদের প্রিয় সেলিব্রেটি করছেন। ফলে ভাষা বিকৃতি খুব দ্রুত ছড়াচ্ছে।

এবার মূলবক্তব্যে ফিরে যাই। তার আগে দুটো বিষয়ে পাঠকদের নিশ্চিত করি। আমি নির্দিষ্ট কোনো আঞ্চলিক ভাষাকে ছোট করে দেখছি না। এদেশের প্রত্যেকটা আঞ্চলিক ভাষা আমাদের অমূল্য সম্পদ। সকল আঞ্চলিক ভাষা বেঁচে থাকুক দীর্ঘকাল। আর ব্যক্তিগতভাবে আমি ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতির প্রতি বেশ কৌতুহলী। পড়াশোনা ও জীবিকার তাগিদে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বসবাসের সুযোগ হয়েছে। এসময়টাতে ভাষার ব্যাপারে বেশ কয়েকটি অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। রাজধানী ঢাকার প্রসঙ্গেই বলি। কাঁচাবাজারগুলোতে বাজার করতে গিয়ে যেদিন প্রমিত বাংলায় কথা বলতাম সেদিন মাছ-সবজি ইত্যাদি কিনতে গিয়ে বেশিই টাকা দিয়ে আসতে হতো। আর যেদিন ঢাকার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতাম সেদিন বাজার করতে সুবিধা হতো। ঢাকার মাছ বিক্রেতা, সবজি বিক্রেতা, রিক্সাওয়ালা থেকে শুরু করে বাসের হেল্পার-কন্ডাক্টার, বিভিন্ন দোকানদার এভাবেই সবাইকে মাপে। যারা মার্জিতভাষায় কথা বলে তাদেরকে কায়দা করা সহজ। কারণ তার ভাষাব্যবহার দেখেই বুঝা যায়, সে একজন নিরেট ভদ্রলোক। আর ভদ্রলোকরা সম্মানের ভয়ে তাদের পাল্টা জবাব দেয় না। রাজধানী ঢাকায় যারাই এসেছে, শুরুর দিকে এই তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি, এরকম লোক খুব কমই পাওয়া যাবে। প্রমিত বাংলায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তারা যদি মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্তের হন, তবে চেষ্টা করেন রাজধানীর এই ভাষারীতি গ্রহণ করে নেয়ার। এছাড়া উপায় নেই। আর যারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, দামাদামি করতে পচ্ছন্দ করেন না, উনারা বাজার করেন নামিদামি গ্রোসারি শপগুলোতে। সেগুলোতে অন্তত ভাষার ভদ্রতাবোধ শুরু করে বাকি সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এজন্যই শিরোনামে বলেছি – শুদ্ধ বাংলার খরচা বেশি। এখন হয়তো বুঝতে পেরেছেন কেনো ঐ কন্টেন্ট নির্মাতারা ভাষার এই অপব্যবহার করছেন।

বাংলাদেশ কোনো উন্নত রাষ্ট্র নয়। আমাদের দেশে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের সংখ্যাই বেশি। এই বৃহৎ সংখ্যাটিই যখন প্রমিত বাংলায় কথা বলতে চাইলেও বেঁচে থাকার সংগ্রামে পারছে না, ইচ্ছের বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে গ্রহণ করে নিতে হচ্ছে ভিন্ন একটি ভাষারীতি, তখন এই বিষয়টি মোটেও সুখকর নয়। আজ থেকে পঞ্চাশ-একশো বছর পর প্রমিত বাংলার অবস্থান কোথায় যাবে সেটা কল্পনাও করা যায় না।

এটা থেকে উত্তোরণের উপায় কি? বাংলাদেশের প্রত্যেক অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষাস্তর থেকেই প্রমিত বাংলা ভাষাচর্চার নিশ্চিত করতে হবে। শুনতে খারাপ লাগলেও বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কেবলমাত্র বইয়ের পড়ার সময় প্রমিত বাংলায় কথা বলা হয়, এর বাইরে খোদ শিক্ষকরাই আঞ্চলিক ভাষায় ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কথা বলেন। ফলে বইয়ের পড়ার বাইরে প্রমিত বাংলায় কথা বলতে তাদের মধ্যে একধরণের অনীহা ও লজ্জা কাজ করে। এই অনীহা ও লজ্জা একসময় ভাষার ভদ্রতাবোধ, মার্জিত আচরণ উপেক্ষা করে ভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সাথে নিজস্ব আঞ্চলিকভাষায় কথা বলতে বাধ্য করে। কারণ তিনি তো প্রমিত বাংলায় কথা বলতে অভ্যস্ত নন। সরকারি-সাংগঠনিক ও ব্যক্তি উদ্যোগে প্রমিত বাংলা চর্চার প্রতি গণসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি সর্বস্তরে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একমাত্র প্রকৃত শিক্ষাই পারে আমাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর করতে। সকল ভাষা টিকে থাকুক সকলের স্বপ্নে-জাগরণে। [দৈনিক দেশেরপত্রে প্রকাশিত]
©ইলিয়াস আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *